Wednesday, 2 September 2026

মওলানা রূমী (রহ:)-এর দৃষ্টিতে প্রকৃত সূফী ও ভণ্ডের পার্থক্য

 ভণ্ডরা সূফীবৃন্দের কথাবার্তা চুরি করে নিজেদের বলে চালিয়ে দেয়; আর এর ফলে তারা মানূষদেরকে সে সব সুন্দর শিক্ষাসমূহ দ্বারা ধোকা দেয়, যেগুলোর তারা অনুকরণকারীমাত্র। যে বিষয় সম্পর্কে তারা কথা বলে, সে ব্যাপারে কোনো প্রকৃত জ্ঞানই তাদের নেই। মহান সূফী মাশায়েখবৃন্দের অনেকেই প্রতারক ভণ্ডদের কথা উল্লেখ করেছেন - এ সব লোকেরা ‘সূফী’ খেতাবটি গ্রহণ করে, কেননা তা তাদেরকে বিশেষ মর্যাদা ও ক্ষমতা এনে দেয়; আর তারা সে সব মানুষের সাথে প্রতারণার আশ্রয় নেয় যারা প্রকৃত সূফীবাদী সিদ্ধপুরুষ ও ভণ্ড লোকের মাঝে পার্থক্য নির্ণয় করতে অক্ষম।


আল্লাহওয়ালা কোনো সিদ্ধপুরুষের দ্বারা প্রশিক্ষিত শিষ্যের আত্মা নির্মল ও পরিশুদ্ধ হয়। কিন্তু কোনো ভণ্ড ও কপট লোক দ্বারা প্রশিক্ষিত শিষ্য, যে নাকি ওই ভণ্ডের থিওরী শিখেছে, সে কেবল তার গুরুর মতোই হবে
: ঘৃণ্য, দুর্বল, অক্ষম, গোমড়া-খিটখিটে স্বভাবের, অনিশ্চয়তা থেকে কখনোই মুক্ত নয়, এবং তার সকল ইন্দ্রিয়ে সে ঘাটতিপূর্ণ। ...“এবং কাফেরদের সাহায্যকারী হচ্ছে তাগুত (শয়তান, উপাস্য মূর্তি), যারা তাদেরকে আলো থেকে অন্ধকারে টেনে নিয়ে যায়” (সূরা বাকারা, ২৫৭ আয়াত)। [”ফীহি মা ফীহি” হতে সংকলিত; ডব্লিউ, সি, চিত্তিক কর্তৃক ‘দ্য সূফী পাথ অফ লাভ: দ্য স্পিরিচুয়াল টিচিংস অফ জালালউদ্দীন রূমী’ ১৪৫ পৃষ্ঠায় অনূদিত]

উপরন্তু, ভণ্ড ও তাদের ক্ষতি সম্পর্কে কবিতায় মওলানা রূমী (রহ:) বলেন: “তুমি হলে এমন একজনের শিষ্য ও অতিথি, যে ভণ্ড লোক তার জঘন্যতায় তোমার সমস্ত অর্জনকে চুরি করে নেবে। সে তো বিজয়ী (সফল) নয়, সে কীভাবে তোমাকে সাফল্যমণ্ডিত করবে? সে তোমায় আলোর দিশে দেবে না, বরং অন্ধকারাচ্ছন্ন করবে। তার যেহেতু কোনো আলো নেই, এমতাবস্থায় তার সাথে সম্পৃক্ত হয়ে অন্যরা কীভাবে আলোর দিশে পেতে পারে? চোখের নিরাময়-প্রত্যাশী অন্ধের মতো সে তোমার চোখে পশম ছাড়া আর কী-ই বা দিতে পারবে? আল্লাহতা’লার সুঘ্রাণ বা খোঁজ ওই ভণ্ডের কাছে নেই, কিন্তু তার দাবিগুলো শীষ (আ:) বা আদম (আ:)-এর চেয়েও বড়। শয়তান স্বয়ং তার সামনে আসতে বিব্রত; ওই ভণ্ডরা বারংবার বলে, ‘আমরাই সূফী-দরবেশ, বরং তার চেয়েও বড়।’ দরবেশবৃন্দের অনেক বাণী ভণ্ড লোকটি চুরি করে থাকে, যার দরুণ মানুষেরা হয়তো ভাবে সে আসলেই কেউ একজন। তার কথাবার্তায় সে অকারণে এমন কি হযরত বায়েযীদ বোস্তামী (রহ:)-এর খুঁতও ধরতে চায়; দুরাচারী এয়াযীদও তার সামনে শরমিন্দা হয়। কিন্তু ওই ভণ্ড বেহেস্তের রুটি ও খাদ্যসম্ভার হতে বঞ্চিত, দুঃস্থ; আল্লাহতা’লা তাকে একটি হাড়-ও ছুঁড়ে দেন নি (কুকুরের সামনে যেমনি খাবার ছোঁড়া হয়)।” [মওলানা রূমী (রহ:) প্রণীত ‘মসনবী শরীফ’, ১ম খণ্ড, পংক্তি ২২৬৫-৬৮, ৭২-৭৬, প্রাগুক্ত ‘দ্য সূফী পাথ অফ লাভ: দ্য স্পিরিচুয়াল টিচিংস অফ জালালউদ্দীন রূমী’, ১৪৫-৬ পৃষ্ঠা]

অতএব, আমরা দেখতে পাচ্ছি যে মওলানা জালালউদ্দীন রূমী (রহ:)-এর মতো মহান শায়খ (পীর)-ও ভণ্ডদের ব্যাপারে আমাদেরকে সতর্ক করেছেন। অতীতের চেয়ে বর্তমানকালে ভণ্ডদের দৌরাত্ম্য বেশি। তাই শরীয়ত-মান্যকারী প্রকৃত সূফী-দরবেশবৃন্দকে শরীয়ত অমান্যকারী ভণ্ডদের কাছ থেকে পৃথকভাবে আমাদের চিনতে শিখতে হবে।

বুযূর্গানে দ্বীন রূহানীভাবে জীবিত

 - কাজী সাইফুদ্দীন হোসেন


হায় রে মুসলমান! কিছু মুসলমান কুরআন পড়েন, কিন্তু চিন্তা করেন না। অথচ আল্লাহ আমাদেরকে এ ব্যাপারে চিন্তাশীল হতে বলেছেন। আসুন, এ রকম একটি বিষয়ে আলোকপাত করা যাক। কুরআন মজীদে বলা হয়েছে, “কুল্লু নাফসিন যা’য়েকাতুল মওত”; অর্থাৎ, সকল নফস তথা প্রাণী-সত্তা মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। এখানে তো আল্লাহ বলেন নি, “কুল্লু রুহিন যা’য়েকাতুল মওত” - সকল রূহ তথা আত্মা মুত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবেন। ইসলামী দলিল-আদিল্লার কোথাও এ ধরনের কথা নেই। আর আমরা সহীহ আকীদাপন্থীরা এটাই দাবি করছি যে আম্বিয়া (আ:), সিদ্দিকীন (রহ:), শুহাদা (রহ:) এবং সোয়ালেহীন (রহ:)-বৃন্দ রূহানী তথা আত্মিকভাবে জীবিত। তাছাড়া, মহানবী (দ:) আদেশ দিয়েছেন, ”মুতূ কাবলা আন তামুতু” - “তোমাদের (নফসের) মৃত্যুর আগে মৃত্যু বরণ করো!” বুযূর্গানে দ্বীনের যে রূহানী মৃত্যু নেই, তার প্রমাণ হলো সূরা বাকারার ১৫৪ নং আয়াত; এরশাদ হয়েছে, “আল্লাহর রাস্তায় (জ্বেহাদে) যারা কোরবানি হয়ে গিয়েছেন, তাঁদেরকে তোমরা ’মৃত’ বলো না, বরঞ্চ তাঁরা জীবিত, কিন্তু তোমরা তা উপলব্ধি করতে অক্ষম।” লক্ষ্য করুন, আল্লাহর রাস্তায় জ্বেহাদ ২ প্রকার: ১/ জ্বেহাদে আসগর বা ছোট জ্বেহাদ যা দ্বীনের শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ময়দানে করা হয়; এবং ২/ জ্বেহাদে আকবর, যা নিজের নফসের বিরুদ্ধে করতে হয়। মহানবী (দ:) কোনো এক জ্বেহাদশেষে ফিরে এসে এ প্রসঙ্গে বলেন, ”ছোট জ্বেহাদ থেকে প্রত্যাবর্তন করলাম বড় জ্বেহাদের দিকে।” বুযূর্গানে দ্বীন তাঁদের সারা জীবন এই বড় জ্বেহাদে অংশগ্রহণ করে থাকেন। তাই তাঁরাও শহীদানের মতোই এই আয়াতের বিষয়বস্তু হন। এখন দেখুন, আল্লাহ নিষেধ করছেন তাঁদেরকে ‘মৃত’ বলতে, যেমনিভাবে নিষেধ করা হয়েছে হারাম সংঘটন, ঘুষ গ্রহণ, সুদ লেন-দেন, অপরের জান-মাল হরণ ইত্যাদি। অথচ কী আশ্চর্য! কিছু মুসলমান আল্লাহর এই নিষেধাজ্ঞা না মেনে ওই সকল বুযূর্গকে বলছেন ‘মৃত’। আলোচ্য আয়াতে করীমায় আল্লাহ এর গুরুত্ব বোঝাতে আরও যোগ করেন ”বরঞ্চ (বাল) তাঁরা জীবিত (অর্থাৎ, তাঁরা আসলেই জীবিত), কিন্তু (লাকিন) তোমরা তা উপলব্ধি করতে অক্ষম।” এই যে তিনি জোর তাকিদ দিতে ‘বরঞ্চ’ ও ‘কিন্তু’ শব্দগুলো ব্যবহার করলেন, এরই মধ্যে তাঁর ভেদের রহস্য নিহিত রয়েছে। তিনি কী সত্য বলেছেন - ‘তোমরা তা উপলব্ধি করতে অক্ষম’! আমরা মোমেন মুসলমান সমাজ এটা উপলব্ধি না করতে পারলেও এতে বিশ্বাস করি। যারা বিশ্বাস করবে না, তারা ঈমানদার হিসেবে আল্লাহর কাছে গৃহীত হবে না।

মওলানা রূমী (রহ:) - ঐশী প্রেমের দর্পণ

 মূল: শায়খা ফাতেমা ফ্লিয়র নাসেরী বন্নিন (অস্ট্রেলিয়া)

অনুবাদ: কাজী সাইফুদ্দীন হোসেন


[মার পীর ও মুর্শীদ আউলিয়াকুল শিরোমণি হযরতুল আল্লামা শাহ সূফী আলহাজ্জ্ব সৈয়দ এ, জেড, এম, সেহাবউদ্দীন খালেদ আল-কাদেরী আল-চিশ্তী সাহেব কেবলা (রহ:)-এর পুণ্য স্মৃতিতে উৎসর্গিত]

মওলানা জালালউদ্দীন মৌলভী, যাঁকে পশ্চিমা বিশ্ব ‘রূমী’ নামে চেনে, তিনি পরিচিত ঐশী প্রেমের দূত হিসেবেও - যে খোদায়ী এশক সমস্ত সৃষ্টিজগৎ ও জীবসত্তার ধমনীতে স্পন্দিত, আল্লাহতা’লার বাণী মোতাবেক যে প্রেমের কারণে এই সৃষ্টিজগতের উৎপত্তি। ‘গুপ্ত ভাণ্ডার’ নামে খ্যাত হাদীসে কুদসীতে হযরত দাউদ (আ:) মহান আল্লাহতা’লাকে এই বিশ্বজগৎ সৃষ্টির উদ্দেশ্য সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। এমতাবস্থায় তিনি তা ব্যক্ত করেন, “আমি ছিলাম রহস্যের গুপ্ত ভাণ্ডার; অতঃপর আমি ভালোবাসলাম নিজের পরিচয় প্রকাশ করতে। তাই আমি সৃষ্টি করলাম এই বিশ্বজগৎ, নিজেকে পরিচিত করানোর জন্যে।” অতএব, এই হাদীসে কুদসীর মর্ম অনুযায়ী জগৎ সৃষ্টির উদ্দেশ্য আল্লাহকে জানা, আর মাধ্যম হলো মহব্বত (ঐশীপ্রেম)।

আমরা খৃষ্টধর্মের শীর্ষ আজ্ঞানামা ‘গসপেল’-এর বিভিন্ন বর্ণনায়ও অনুরূপ একটি বার্তা দেখতে পাই, যা’তে ’যীশু খৃষ্ট’ (ঈসা মসীহ আলাইহিস্ সালাম) এই ঐশীপ্রেমকে চূড়ান্ত খোদায়ী বিধান আখ্যায়িত করেছেন; তিনি বলেন: “তোমরা তোমাদের প্রভু, তোমাদেরই খোদাকে সর্বান্তকরণে ভালোবাসবে, পুরো আত্মা এবং গোটা মস্তিষ্ক দিয়ে
ভালোবাসবে ।” এই ঐশীপ্রেমের অভিজ্ঞতা-ই সকল সূফী-গুরু সঞ্চয় করেন, এ ব্যাপারেই কথা বলেন এবং লেখালেখি করেন; যে বিষয়টিতে মওলানা রূমী (রহ:) সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করেছিলেন এবং এর মধ্যমণি ও তার প্রতিবিম্বতে পরিণত হয়েছিলেন।

মওলানা আবদুর রহমান জামী’ (রহ:), যিনি ১৫ শতকের পারসিক সূফী কবি, তিনি মওলানা সম্পর্কে বলেন:

ওই মহৎ গুণ
    আমি কীভাবে করিবো বর্ণন
তিনি নন কোনো নবী
    তবু তাঁর আছে একখানি বহি


অন্যত্র তিনি বলেন:

মওলানার ‘মসনবী’ কেতাব
   যেন কুরআনের ফারসী অবয়ব


আল-কুরআন ও মসনবী শরীফের মধ্যে এ ধরনের অনেক উপমা দেয়া হয়েছে, যথা - অনেক অন্তর্নিহিত অর্থে পরিপূর্ণ ঘটনা ও সেগুলোর বিন্যাস সম্পর্কে গভীরতর উপলব্ধি। এটিও একইভাবে বিশ্বাস করা হয়, আল-কুরআনের প্রারম্ভিক সূরা ফাতিহার ৭টি আয়াত যেমন সমস্ত কুরআনের সারসংক্ষেপ, তেমনি মসনবী শরীফের সূচনার ১৮টি পংক্তিও ওর আনুমানিক পঁচিশ হাজার পংক্তির সারসংক্ষেপ। এ সব উপমা মওলানা রূমী (রহ:)-এর বাণী কতো উচ্চ মকামের তা ইঙ্গিত করে।

এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য সাধনের জন্যে আমি মওলানা রূমী (রহ:)-এর কথাবার্তা প্রায় হুবহু উদ্ধৃত করবো
; তবে এখানে বলা দরকার যে নিকোলসনের পরলোক গমনের পর হতে এ যাবতকালে মওলানার বাণী খুঁজে পাওয়াটা কঠিন হয়ে গিয়েছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আজকাল মওলানা রূমী (রহ:)-এর পদ্যে তাঁর বাণীর অংশ খুব কমই থাকে; পক্ষান্তরে, অনুবাদক ও লেখকদের সম্পর্কেই বিশদ বর্ণনা সন্নিবেশিত হয়। তাই আমি মনে করি সবার জন্যে সবচেয়ে ভাল হয় যদি মওলানার নিজস্ব বাণী নিখুঁতভাবে তুলে ধরা হয়। আমি আরও যোগ করতে চাই, এ রকম যে ঘটবে তা মওলানা জানতেন, আর সে জন্যে তিনি ’মসনবী’র সূচনার ৬ষ্ঠ পংক্তিতে এ ব্যাপারে আগাম সতর্ক করেছিলেন।

মওলানা সূচনায় বলেন:

শোনো, এই বাঁশি কেমনে ব্যক্ত করে কাহিনী যতো
                              বিরহ-জ্বালায় এটি সদা বিলাপরত


এই সূচনা-পংক্তিতে মওলানা নিজেকে বাঁশির সাথে তুলনা করেছেন, যে বাঁশি ঐশী প্রেম-মুর্ছনা তথা ‘আলাসতু বি রাব্বিকুম’-এর সুর বাজিয়ে আমাদেরকে বিরহ-বেদনার কাহিনী শোনাবে।

আলাসতু বি রাব্বিকুম’ বাক্যটি বর্ণিত হয়েছে আল-কুরআনে (৭:১৭২), যার তাফসীরে বিবৃত হয়েছে যে সৃষ্টির প্রাকলগ্নে, মানে পৃথিবীতে জীবন শুরুর আগে আল্লাহ পাক সকল রূহ (আত্মা)-কে ডেকে পাঠান এবং সমগ্র মানব জাতিকে জিজ্ঞেস করেন, ‘আলাসতু বি রাব্বিকুম?’ অর্থাৎ, আমি কি তোমোদের প্রভু নই? সবাই উত্তর দেয়, ‘বালা শাহিদনা’, অর্থাৎ, জ্বি, আমরা তা সাক্ষ্য দিচ্ছি।

এটি প্রতীয়মান হয় যে মওলানার সমগ্র কাব্য ও মুর্ছনায় ‘আলাসতু বি রাব্বিকুম’-এর মূল সুরের স্মৃতিচারণ ও উপলব্ধি অন্তর্নিহিত; যেমনটি তিনি বলেন:

যেহেতু তিনি আমার আত্মার কানে ‘আলাসতু’র গোপন রহস্য করেন ব্যক্ত
                            তাই আমার হৃদ-রাজ্য হতে তাঁর নৈকট্যের আকাঙ্ক্ষা হয় না তিরোহিত


কিন্তু এই উপলব্ধি যা আমাদের জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, তা কোনো সহজ কাজ নয়; আর তা সহজে প্রাপ্তিসাধ্যও নয়। ফলে আমরা একে আমাদের নিজস্ব বুঝ ও সমঝ অনুযায়ী ঢেলে সাজাতে চেষ্টা করি। মসনবী শরীফের সূচনার ৬ষ্ঠ ছত্রে মওলানা এ ব্যাপারে বলেন:

সবাই আমার সাথী হয়েছে নিজস্ব সমঝ মোতাবেক
         কেউই জানতে চায় নি আমার গোপন রহস্য ও নানা ভাবনার উদ্রেক

এর অব্যবহিত পরেই তিনি বলেন:

আমার এই সরব আর্তি থেকে নয়কো দূর আমারই গোপন রহস্য
              কিন্তু তা দেখার বা শোনার মতো জ্যোতি কারো নেই অবশ্যঅবশ্য


এই ’নূর’ (জ্যোতি) কী জিনিস, রহস্য জানার ক্ষেত্রে সাধারণ চোখে যা দেখা যায় না এবং কানেও শোনা যায় না? এর উত্তর খুঁজতে চলুন স্বয়ং মওলানার দ্বারস্থ হই, যেহেতু তিনি বলেছেন তাঁর বইতে তিনি সব কিছু প্রকাশ করেছেন - কখনো ব্যাখ্যা দ্বারা, কখনো বা পরোক্ষ উল্লেখ করে, আবার কখনো ইশারায়। তা কেন? তাঁর ব্যাখ্যা শুনুন:

গোপন রহস্যগুলো ছত্রে ছত্রে লুকায়িত
    যা আমি আরও স্পষ্ট বল্লে দুনিয়ার নিয়ম হবে ব্যাহত


আরেক কথায়, সবাই যদি সত্য/বাস্তবতা সম্পর্কে জানতে পারতো, তাহলে কেউই আর দুনিয়ার কাজ-কর্মে নিমগ্ন হতো না। এ কারণেই আলোকিত মানবের সংখ্যা সব সময়েই খুব কম হয় সর্বসাধারণের তুলনায়। আল-কুরআনও বারবার তাই এরশাদ ফরমায়, “স্বল্প সংখ্যক-ই জানবে”, অথবা “স্বল্প সংখ্যক-ই উপলব্ধি করবে”, কিংবা ”স্বল্প সংখ্যকই চিন্তা করবে” ইত্যাদি।

মওলানার পূর্ববর্তী শ্লোকে ফেরা যাক:

আমার এই সরব আর্তি থেকে নয়কো দূর আমারই গোপন রহস্য
              কিন্তু তা দেখার বা শোনার মতো জ্যোতি কারো নেই অবশ্যঅবশ্য


এই নূর বা জ্যোতি
দর্শন ও শ্রবণে আমাদেরকে কিসে বাধা দিচ্ছে সে সম্পর্কে জানার আগ্রহে চলুন আবারও মওলানার শরণাপন্ন হই; তিনি বলেন:

মানবচক্ষে বসানো ঠুলি
গৌণ বিষয়ে রেখেছে তাদের আবদ্ধ
     এই গৌণের উর্ধ্বে না উঠলে ’আসহাব’-বৃন্দের অন্তর্ভুক্ত হবার দ্বার রুদ্ধ 

অতএব, মওলানা যে দর্শনক্ষমতার কথা বলেছেন, তা হলো বাস্তবতাকে দেখতে সক্ষম চোখ; আর তা মানুষ, বস্তুগত জগৎ, এবং সর্বোপরি, সবচেয়ে বড় বাধা নফস (নিজের একগুঁয়ে সত্তা/কুপ্রবৃত্তি) দ্বারা যেন পর্দায় আবৃত না হয়। আমাদের এমন দর্শনক্ষমতা প্রয়োজন যা গৌণ বিষয়ের ঊর্ধ্বে উঠে মুখ্য বিষয়টি অবলোকন করতে সক্ষম। মওলানা বলেন:

আমি এমন চক্ষু চাই যা রাজাধিরাজকে জানতে সক্ষম
     যাতে তাঁর বিভিন্ন বেশভূষায় তাঁকে চেনার উপায় হয় মোক্ষম
 

কেউ এ চোখ কীভাবে লাভ করতে পারে? মওলানা সূফী-দরবেশদের পথে সফর করতে আমাদেরকে দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন:

সূফী-দরবেশদের মালিকানায় যে সুরমা, তা করো অন্বেষণ
      যাতে তোমাদের দৃষ্টিশক্তির সরু জলধারা হয় মহাসাগরে পরিবর্তন


আমাদের সাথে সর্বদা বিরাজমান এই পর্দাটি কী এবং কেনই বা তা আমাদের সামনে বাস্তবতা সম্পর্কে ভিন্ন বিবরণ তুলে ধরে? অথচ এই বিবরণকে আমরা সত্য বলেই মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি। (একগুঁয়ে) সত্তা কী এবং কীভাবে তা আমাদেরকে সত্য ও বাস্তবতা উপলব্ধিতে বাধা দিয়ে থাকে?

সুফী মনঃস্তত্ত্ব আমাদেরকে এর গভীরে যেতে সহায়তা করতে পারে। মনোবিদ্যা আমাদেরকে বলে, মানসিক ভারসাম্যহীনতা বা স্নায়ুচাপের কারণে স্বাভাবিক চিন্তাভাবনা যারা হারিয়ে ফেলে, তারা স্বাভাবিক মানুষের তুলনায় বাস্তবতা সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা বা অবাস্তব চিন্তা পোষণ করে থাকে। কিন্তু মনোবিদ্যার দৌড় ওই পর্যন্তই। পক্ষান্তরে, সূফী-দরবেশদের মনঃস্তত্ত্ব আরও অগ্রসর হয় এবং এর ক্ষেত্রও সম্প্রসারিত হয়, যার ফলে আমরা উপলব্ধি করতে পারি যে তথাকথিত স্বাভাবিক মানুষের বাস্তবতাসম্পর্কিত ধারণা আধ্যাত্মিক জগতে যাত্রাকারী সূফী-দরবেশদের কাছে অত্যন্ত সীমাবদ্ধ ও ভ্রান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।

মওলানা যখন আমাদেরকে বলেন সূফী-দরবেশদের পথে যাত্রা করতে, যাতে আমাদের দৃষ্টি সুপ্রসারিত হয়, তখন তিনি (ঐশীপ্রদত্ত) দর্শনক্ষমতা ও অন্তর্দৃষ্টির দিকেই ইঙ্গিত করেন। কেননা, আলোকিত মানব যা দেখতে পান এবং উপলব্ধি করেন, তা অধিকাংশ মানুষের কাছে সহজলভ্য নয়। আধ্যাত্মিকতার আলোয় উদ্ভাসিত জন তাঁদের প্রাপ্ত আলোকোচ্ছটার অংশ অনুযায়ী
বিভিন্ন মাত্রায় অদৃশ্য জ্ঞান পেয়ে থাকেন।

অতএব, আমাদেরকে বুঝতে হবে যে দৃষ্টিশক্তির প্রকারভেদ রয়েছে; আর এও অনুধাবন করতে হবে যে আমাদের অহংবোধ কতোটুকু সীমাবদ্ধ এবং তাই সেটিকে চূড়ান্ত বাস্তবতা হিসেবে না মনে করা আমাদের কর্তব্য। আমাদেরকে খেয়াল রাখতে হবে যে আমরা যা চিন্তা করি এবং দেখি তা চূড়ান্ত নয়, এর বাইরেও আরেকটি দৃষ্টিক্ষমতা আছে যার জন্যে প্রয়োজন সূফী পথে পরিভ্রমণ ও অহংবোধের চেতনার ঊর্ধ্বে ওঠা।

আমি এই চোখ, দৃষ্টিক্ষমতা ও অন্তর্দৃষ্টির বিষয়টিকে আরেকটি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে চাই। কেননা, ’মসনবী’র মহাসাগরে যেদিকেই তালাশ করি না কেন, সেখানে বিভিন্ন ধরনের মুক্তা আমরা খুঁজে পাই। ওই মুক্তাগুলো একত্রিত করার পরই কেবল পুরো গলার হার আমরা দেখতে পাই।

এক্ষণে আমরা মওলানার সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ও পছন্দনীয় কবিতা তথা ’গযল’ তাঁর ‘দেওয়ানে শামসে তাবরিয’ থেকে বেছে নেবো। প্রথম পংক্তি নিম্নরূপ:

আমি ছিলাম মৃত, অতঃপর হলাম জীবন্ত
ছিলাম অশ্রুজল
, হলাম হাসিতে পরিণত
ভালোবাসা বিস্তার করলো (আমা মাঝে) রাজত্ব
সম্রাট হিসেবে পেলাম আমি চির স্থায়িত্ব

এমনি এক সূচনা যা’তে মৃত অবস্থা থেকে জিন্দা হয়ে, কান্না থেকে হাসিতে রূপান্তরিত হয়ে, ভালোবাসার রাজত্বে পৌঁছে এবং তাকে স্থায়ী সাম্রাজ্যে পরিণত করে - সব একই ছত্রে প্রকাশ করে - মওলানা যেন আমাদের বলছেন: তোমরা কি এখন আমার সাথে এই সফরে শরীক হবে? আর যেহেতু এই আমন্ত্রণের আসল উৎস ’হু’ তথা হক্ক সোবহানাহু ওয়া তা’লা স্বয়ং, যিনি মওলানার পবিত্র জবান দ্বারা কথা বলছেন, সেহেতু আমরাও বলি, ‘জ্বি’। অতঃপর আমরা যখন জিজ্ঞেস করি, ’কীভাবে হবো এই সফরে শরীক’, তখন আমরা সেই একই জবাব শুনতে পাই যা শায়খ মহিউদ্দীন ইবনে আরবী (রহ:) শুনেছিলেন আল্লাহর সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠ আলাপের কোনো একটিতে, যেখানে তিনি প্রশ্ন করেছিলেন ’কেউ আপনার নৈকট্য কীভাবে পেতে পারে?’ আর আল্লাহ জবাব দিয়েছিলেন, ‘এমন এক গুণ বা বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে যা আমার নেই।’ মানে ’উবুদিয়্যাত’ তথা গোলামি দ্বারা।

এই কারণেই মওলানা তাঁর কাব্যের পরবর্তী দশটি পংক্তি, যথা - ৩ থেকে ১২ পংক্তিতে, তাঁর নিজের অভিজ্ঞতালব্ধ উবূদিয়্যাত-এর পর্যায়গুলোর বিভিন্ন দিক বর্ণনা করেন ও বিশদ চিত্র আঁকেন। তিনি সার্বিকভাবে সূফী পথের স্তরগুলো, এবং বিশেষভাবে নিজ পীর শামস তাবরিযী (রহ:)-এর সাথে তাঁর সোহবতের ধাপগুলোকে একই সূত্রে গেঁথেছেন, যা’তে পরিস্ফুট হয়েছে (খোদায়ী) আজ্ঞা পালনে সদিচ্ছা, (কোরবানির) বেদিতে নিজ শির উৎসর্গ, সেই উবূদিয়্যাত ও গোলামির বহিঃপ্রকাশ, যেটি অন্তরে (ঐশী) প্রেমের রাজসিকতা ও রাজত্বের প্রবেশপথের দ্বার উম্মুক্ত করে থাকে।

‘মসনবী শরীফ’-এর কবিতা পাঠকালে মনে রাখা জরুরি শায়খ শামস তাবরিযী (রহ:)-এর সাথে সাক্ষাৎ ও এ পথে চলা শুরু করার সময় সমাজের কী উচ্চস্থানে মওলানা অধিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি ছিলেন সমাজে মহাসম্মানিত এক ইসলামী জ্ঞান বিশারদ, ধর্মতত্ত্ববিদ ও ধর্মীয় আইনশাস্ত্রজ্ঞ, অনেক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে এগুলো কয়েকটিমাত্র; আর মানুষেরা দূর-দূরান্ত থেকে তাঁর জ্ঞানগর্ভ ওয়ায শোনার জন্যে সফর করে তাঁর কাছে আসতেন। তাই আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন এই পথে পা বাড়াতে গিয়ে তাঁর কতো কিছু হারাবার ছিল।

আমি এই পরিচ্ছেদের কয়েকটিমাত্র ছত্র উদ্ধৃত করবো যাতে আপনারা এর স্বাদ আস্বাদন করতে সক্ষম হন:

তিনি বলেন, তুমি নও এখনো প্রেমে বাতুল
নও কো এ ঘরানার ফুল
আমি সফর করে হলাম বাতুল
গোলামির বন্ধনে আমূল

তিনি বলেন, তুমি এখনো নও হত
নও কো উচ্ছ্বাসে আপ্লুত
সামনে রেখে তাঁর জীবনদানকারী চেহারা পুতঃ
আমি হলাম হত ও শির অবনত


তিনি বলেন, তুমি হলে শেখ ও সরদার
সমাজের নেতা ও আমির-রাহবার
আমি রইলাম না আর শেখ ও সরদার
হলাম আপনার হুকুম বরদার

ওপরের ছত্রগুলো বহু ছত্রের কয়েকটিমাত্র, যেগুলোতে মওলানা তাঁর ‘উবূদিয়্যাত’ ও গোলামির বিভিন্ন দিকের ওপর আলোকপাত করেছেন।

মওলানা তাঁর নিজের দৃষ্টান্ত থেকে আমাদেরকে কী শিক্ষা দিতে চেয়েছেন, তা কেবল গভীর মনোযোগ দ্বারাই আমরা উপলব্ধি করতে পারি। এই কাব্যের সৌন্দর্য উপভোগ করাই যথেষ্ট নয়, কেননা তা তাঁর কর্মের প্রকৃত উদ্দেশ্য নয় এবং তাঁর এখানে অবস্থানেরও কারণ নয়। নফস (একগুঁয়ে সত্তা) দমনের এ সকল স্তর পেরিয়ে তিনি পরবর্তী স্তরে উপনীত হয়েছেন, আর তা তিনি ১৩ নং পংক্তিতে ব্যাখ্যা করেন এভাবে:

আমার অন্তর অনুভব করে আত্মার রক্তিমাভা
হৃদ-রাজ্য হয় উম্মুক্ত ও ভেঙ্গে টুকরা
আমার অন্তর বুনে এক নতুন রেশমের জামা
অতঃপর এই জীর্ণ পুরোনোটির সাথে আমার বৈরিতা

কাব্যের এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পদ। একগুঁয়ে সত্তাকে স্বেচ্ছায় সমর্পণ করার পর এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে তিনি পৌঁছেন যখন রূহ তথা আত্মার আলো তাঁর অন্তরকে বিদীর্ণ করে এবং তিনি এক নতুন জামা বুনেন যা চকচকে মিহি রেশমের তৈরি। ঠিক এই পর্যায়েই তিনি তাঁর পুরোনো জামাটি কতোটুকু জীর্ণ-শীর্ণ তা উপলব্ধি বা অবলোকন করতে সক্ষম হন। আর তাই তিনি ওই জীর্ণ পোষাকের সাথে শত্রুতা পোষণ করেন।

মওলানাকে যখন নতুন জামাটি পরানো হলো, তখনই তিনি উপলব্ধি করলেন তিনি যে জামাটি আঁকড়ে ধরেছিলেন তা কতো বাজে। এখানে তিনি উচ্চতম মকামে উন্নীত হবার পর্যায়গুলো সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন; কেননা উচ্চ মকামের সিঁড়ির প্রতিটি ধাপে পৌঁছার পরই কেবল কেউ খোদাপ্রদত্ত জ্ঞানের আলো দ্বারা নিচের ধাপের বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করতে সক্ষম হন। উপরন্তু, এটিই সেই আলো/জ্যোতি যা মওলানা অন্বেষণ করেছেন এবং সব কিছুই (খোদায়ী) এই নূরের ওপর নির্ভরশীল।

আধ্যাত্মিক জগতে সফরের ধাপগুলো আমাদেরকে এমন (মর্যাদাবান) হবার জন্যে প্রস্তুত করে থাকে, যাকে মওলানা আখ্যা দিয়েছেন ’নূর পাযির’, অর্থাৎ, ঐশী জ্যোতি ধারণক্ষম। এই নূর অনুপস্থিত নয় যে বাস্তবতায় পৌঁছার জন্যে
আমাদেরকে তা খুঁজতে হবে। এই বাস্তবতা, এই নূর সব সময়েই বর্তমান, কিন্তু আমাদের চোখ পর্দার কারণে তা দেখতে অক্ষম। এ কারণেই মওলানা ওই পর্যায়গুলো অতিক্রম করার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা অর্জনকারী কেউ একজন হিসেবে আল্লাহর কাছে দোয়া করেন:

এ মুহূর্ত হতে আমরা আপনার দরবারে ওই চোখ যাচি
এ ছাড়া আর অন্য কোনো কিছু নাহি
যাতে খড়-কুটো ও কাঠি
সমুদ্রকে আমাদের থেকে আড়ালে না পায় কামিয়াবি

অতঃপর পরবর্তী পর্যায়ে ২০তম পংক্তিতে মওলানা আরও এক ধাপ এগোন এবং বলেন:

ওহে কীর্তিমান চন্দ্র, আমি তোমা হতে
দৃষ্টি ফেরাও আমাতে ও তোমাতে
তোমার-ই হাসির অসীলাতে
আমি পরিণত হাস্যোজ্জ্বল পুষ্পপূর্ণ বাগিচাতে

এই পংক্তিতে প্রতিফলিত হয় রূহ তথা আত্মার মাকাম যা খোদাতা’লার আয়নাসদৃশ; আর এ আয়না যতো স্বচ্ছ হবে, ততোই এতে চেহারা দর্শনকারীর মুখাবয়ব স্বচ্ছভাবে ফুটে উঠবে। আমরা জানি, নফস তথা একগুঁয়ে সত্তার সর্বোত্তম পরিশুদ্ধি হলো নিয়ন্ত্রণকারী সত্তা ও দোষারোপকারী সত্তার বিকৃতি থেকে মুক্তি লাভ এবং প্রশান্ত সত্তায় পরিণতি, আর আল্লাহর প্রতিফলনকারী আয়নায় রূপান্তরও। মওলানা (রহ.) ইসলাম ধর্মের মর্মবাণী এখানে তুলে ধরেছেন। সূফীবাদের ভিত্তিই হলো নফসের পরিশুদ্ধি। তাই মওলানা এই ছত্রে বলেন:

আমাকে দেখা বাস্তবে আপনাকেই (খোদাকে) দেখা
কেননা আমি ওই আয়না
আপনার (সন্তুষ্টিসহ) আমাকে দেখে হাসা
আমাকে বানিয়েছে হাস্যোজ্জ্বল পুষ্পপূর্ণ বাগিচা


এই পংক্তিটি আল-কুরআনের একটি আয়াতের সারসংক্ষেপ, যেখানে আল্লাহ পাক তাঁর বান্দার প্রতি খুশি হয়ে বলেন:

”হে শান্তিময় প্রাণ! নিজ প্রতিপালকের দিকে ফিরে যাও এমনিভাবে যে, তুমি তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট এবং তিনিও তোমার প্রতি সন্তুষ্ট; অতঃপর আমার খাস বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হও, এবং আমার জান্নাতে এসো।” [সূরা ফজর, ২৭-৩০ আয়াত]

আমরা এবার শুধু এই দর্শনে দীক্ষিত সমঝদার মানুষের কাছে বোধগম্য কাব্যিক বর্ণনাগুলোকে জোড়া দেবো। অন্তর বিদীর্ণ হয়ে উম্মুক্ত হওয়ার পর যখন রেশমের নতুন এই বস্ত্র পরিধান করানো হয় এবং ’সালেক’ (এই পথের পথিক) আয়নায় তাকান, তখন আসলে কে আয়নার দিকে তাকাচ্ছেন? এটি সে সময়, যখন আয়নায় চেহারা দর্শনকারী যা দেখেন তাতে সন্তুষ্ট হয়ে হাসেন, আর বলেন (কুরআনের ভাষায়) “আমার জান্নাতে এসো”; জান্নাত নয়, বরং ’আমার জান্নাত’ এবং ওই সন্তুষ্টির হাসি তাঁর সমগ্র সত্তায় প্রতিধ্বনিত হয়।

আমি মনে করি, মওলানা রূমী (রহ:)-এর বাণী ও কাব্য বিগত ৮০০ বছর যাবৎ - এবং এর আদি ও অকৃত্তিম রূপ বজায় রাখা সাপেক্ষে ভবিষ্যতেও - এমন জীবন্ত থাকার পেছনে একটি কারণ হলো, এগুলো ঐশীপ্রেম ও উবূদিয়্যাত (গোলামি)-এর বাণী প্রচার করে, যে রজ্জুর অভ্যন্তরীণ ও বহিঃ, স্পষ্ট ও গোপন বিষয়গুলো মানুষকে আল্লাহতা’লার সান্নিধ্যে নিয়ে যায়।

মওলানা ৮০০ বছর আগে এ ব্যাপারে আগাম বলেন:

আমার দেহের সমাধিস্থল কেন হয়েছে দুনিয়াবাসীর তীর্থস্থান?
কেননা দিবারাত্রি এ স্থানের সর্বত্র পূর্ণ করছে তাঁর (খোদার) অবস্থান

ঐশীপ্রেম ও গোলামির এই বাণী দু’দিক ধারালো একখানা তরবারির মতো, যা নফস তথা একগুঁয়ে সত্তার বাধাকে কেটে ঐশীপ্রেমের দ্বার খুলে দেয়; আর এর সমর্থনে রয়েছে আল্লাহ পাকের ক্ষমতা ও এরাদা (ইচ্ছে)। মহান প্রভু মওলানাকে এটি বলার ভাষা দিয়েছেন এবং তিনি বলেন:

আমি হলাম হক্ক (প্রভু)-এর বাণী এবং তাঁরই মাধ্যমে বিদ্যমান
আমিই আত্মার আত্মার খোরাক এবং পরিশুদ্ধির মানিকরতন
আমি হলাম সূর্যের কিরণ, তোমাদের প্রতি করি বিচ্ছুরণ
তবুও সূর্য হতে আমার নেই কোনো পৃথকীকরণ

মওলানার হায়াতে জিন্দেগীর শুরু থেকে শেষ অবধি, বিশেষ করে হযরত শামস তাবরিযী (রহ:)-এর সোহবত তথা সান্নিধ্যের দিকে তাকালে এ কথা বুঝতে অসুবিধা হবে না যে তাঁকে এই উদ্দেশ্যেই বেছে নেয়া, তৈরি ও নিযুক্ত করা হয়েছিল। অন্যান্য সূফীগুরুও এই পথে হেঁটেছেন, কিন্তু মনে হয় আল্লাহতা’লা মওলানার ব্যক্তিগত সফরকে আমাদের সামনে এমনভাবে প্রদর্শন করেছেন যাতে আমরা এর মর্মার্থ অনুধাবন করতে পারি এবং যাতে স্বয়ং মওলানার কাছ থেকেই তা দেখতে ও শুনতে পারি। কেউ শরীয়ত ও তরীকতের পথে হেঁটে হাকীকতে পৌঁছুলে এবং নিজের নফসের জীর্ণ-শীর্ণ বস্ত্র পরিত্যাগ করলে কী ঘটতে পারে?

মানুষকে বিমোহিতকারী ও অন্তরের গভীরে ছুঁয়ে যাওয়া মওলানার এ বাণী তাঁর মাহবুব বা প্রেমাস্পদ খোদাতা’লার সুঘ্রাণ হতেই নিঃসৃত।

খোদার সুরা ঢালার ও সুরা পানের পাত্র আমি
আমি-ই তাঁর সুগন্ধি বণ্টনকারী
আমার দিকে এসো ত্বরা করি
যাতে তোমরা পেতে পারো তাঁর বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত সুগন্ধি

আমাদের কাছে তোমরা শুনেছো যে বাণী
জেনো সে বাণী ঐশী
কেননা, আমরা যা কিছু বলি
সবই তাঁর (খোদায়ী) বাণী


                                                 ----সমাপ্ত----

Waseela (Intermediaries)

 Waseela in the Koran


What does the Koran say about our current topic of discussion, Waseela, that is, intermediaries? Allah says in Surah Mai'dah, ayah 35, (Bismillaahir Rahmaanir Raheem) Yaa ayyuhal-ladhiina aamanut-taqullaaha wabtaghuu ilaiyhil waseelah, meaning "O believers! Fear Allah and seek the means of approach to Him". (Translated from Imam Ahmad Reza Khan's commentary 'Kanzul Eemaan', English version)

In the above ayah, Allah has commanded the 'Mu'minuun', that is, the believers of the Islamic faith, to attain 'Taqwaa', meaning the status of fearing Allah. Abdullah Yusuf Ali, in his commentary, has termed the word as 'doing one's duty to Allah'. The Arabic word Taqwaa means fear of Allah. In Islamic lexicon, it signifies performing act/deeds of piety and refraining from Haram i.e. acts that are prohibited in the religion. In other words, to live in accordance with the Islamic code of life. The person who attains such a status is called a Muttaqiyy.

In the latter part of the above ayah, Allah has commanded us to seek for 'the means to approaching Him'. It is a station of closeness to Him. The Arabic word Waseela, according to Imam Ahmad Reza Khan's Tafseer-i Kanzul Eemaan, means intermediaries. The word does not signify any pious deed or act, or living a life of Islamic piety, since these have been covered by the word Taqwaa quoted in the earlier part of the ayah. Therefore, the word means something other than deeds or acts of piety.

The Prophet (peace be upon him) is a Waseela

Allah says in the Koran, Surah Al-i Imraan, ayah 31, Qul in-kuntum tuhib-bunallaaha fattabi'uunii yuhbib-kumullaahu, meaning "Say (O Prophet): If ye do love Allah, follow me; Allah will love you." The ayah explicitly tells us that our Prophet (peace be upon him) is the Waseela or intermediary that has been referred to in the ayah of Surah Mai'dah. 

Ulamaa-i Haqqaaniyy (Sufi/dervishes) are also Waseela

Our Prophet (peace be upon him) has said, Al-Ulamaau warasatul anbiyaa, meaning "(Islamic) men of knowledge are inheritors of the Prophet." This inheritance relates to Islamic knowledge, and not to any of our Prophet's personal assets or properties, portable or non-portable. The Apostle of Allah has said that Islamic knowledge is made up of two parts; the ones that are explicitly revealed, and those which are hidden i.e. known only to the Sufi Gnostic (Awliya al- Kiraam). Henceforth, the pious ones (Sufi/dervishes) who have acquired Islamic knowledge in whole are the inheritors of the Prophet (peace be upon him). 

Interpretation of the term Waseela 

There are some sects like the Wahhabi, Salafist, Mawdoodi, Tableeghi etc who try to deceive Muslims by misinterpreting the ayah. They say that Waseela does not mean recourse to the pious ones of Allah. However, Hadrat 'Umar (may Allah be pleased with him), the second caliph of Islam, has elucidated the matter for us, as related in the authentic book of (Saheeh) al-Bukhari. Once there was a drought during his caliphate when he along with all the Ashaab-i Kiraam (exalted companions of the Prophet) went outside to pray to Allah for rain. He is quoted in al-Bukhari  as praying, (A'n Anasin radiyallaahu a'nhu) anna U'marabnal Khattabi radiyallaahu a'nhu kaana idhaa quhituu istasqaa bil-A'bbaasibni a'bdil-Muttalibi fa qaala Allaahumma innaa kunnaa natawassalu ilaiyka bi-Nabiyyinaa swallallaahu a'laiyhi wa sallama fatasqiyanaa wa innaa natawassalu ilaiyka bi-a'mmi Nabiyyinaa faasqinaa, meaning "O Allah! We would use our Prophet (peace be upon him) as a Waseela  (means) to You and You then sent us rain; now we are using his uncle (Hadrat Abbas) as a Waseela to You, therefore, send us rain!" Since the caliph used the term Waseela for both the Prophet (peace be upon him) and the pious Hadrat Abbas from among his Ummah i.e. people, hence we can interpret the ayah in question according to the caliph's terminology, wherein not only the Prophet himself but also the pious ones among his Ummah have been referred to as a Waseela. Verily, our Prophet has declared, "O my people! the Sunnah (beliefs and traditions) of the righteous caliphs (of Islam) are ordained upon you" (Mishkat).  Hadrat 'Umar was the second caliph. 

The above-mentioned heretical sects also say that the Hadeeth of al-Bukhari negates recourse to the pious ones who are now wisaal, that is, re-united with Allah in the hereafter. Our reply to this point is that Hadrat 'Umar's words do not imply anything of the sort. He didn't say that recourse to the pious ones who are now wisaal is prohibited in Islam. Rather, he made it clear that recourse to votaries other than the Prophet is permissible (Ja'iz). Besides, a widely known Hadeeth of the Prophet declares, Hayaatiyy khayrullakum wa mamaatiyy khayrullakum, meaning "My worldly life is a blessing to you all, so is my wisaal" (Fatwa-i Bazzazziyya).  This Hadeeth was uttered during the last illness of our Prophet (peace be upon him). All of his companions knew about it.

Furthermore, there is another narration where we come to know of the Sahabi (companion) Bilal ibn al-Harith Muzaniyy, who at the time of drought, during the caliphate of Hadrat 'Umar yet again, went to the Rawdah Shareef (blessed shrine) of our Prophet and implored him to pray to Allah for rain: Fa-qaala yaa rasuulallaahi istasqi li-ummatika fa-innahum qad halakuu; fa-ataahu (sallallaahu alaiyhi wa sallama) fin-nawmi wa akhbarahu annahum yasqawuna; fa-kaana kadhaalika;  meaning He said, "O Apostle of Allah! Pray to Allah for rain so that your Ummah can survive; they are indeed on the brink of extinction!" The Prophet (peace be upon him) appeared in his dream and gave him the good news of forthcoming rain; and it rained as was foretold. The above narration is recorded in Imam Bukhari's Tarikh  and al-Bayhaqi's Dalaiyl. Imam Ibn Hajar Haytami Makki also relates the event in his book Jawharul Munazzam, from where Allama Yusuf Nabhaniy compiled it in his book Shawaahidul Haqq, page 138. Readers may refer to the Bengali edition of Shaykh Yusuf Hashim al-Rifa'i's book Ahle Sunnat wal Jamaater Daleel, page 92, for the narration of the event. The writer is an ex-minister of Kuwait. (The Bengali translator is Mawlana Abdullah al-Ma'ruf, a high official of the Islamic Foundation, Bangladesh)

In conclusion, Allah Almighty has commanded us to seek a Waseela to approach Him; that is to say, we must look for intermediaries in order to reach the desired station of closeness to Him. It is proved by the ayah in question that the said station is attained by intermediaries (Waseela) alone, and not by any A'mal (deed/acts of piety). The evidence we have produced in favor of Waseela being the Prophet (peace be upon him) and the pious ones among his Ummah is irrefutable. May Allah enable all Muslims to recognize the truth, Aameen!

Seeking Help from the Pious Ones of Allah

-Admin


The issue of seeking help from the pious votaries of Allah is supported by the Islamic evidence. We'll provide overwhelming daleels, that is, documents in our book to be published elsewhere (on the Net). Here, we'll only discuss about such an event where recourse to the Sufi Gnostic/dervish/A'alim-Haqqaniyy was taken by none other than the Prophet Sulaiyman (Solomon) himself. 


The Koran states in Surah Naml, Ayahs 38-40, (In the name of Allah, the Most Gracious and the Most Merciful), Qaala yaa ayyuhaal-malauu ayyukum ya'tiniyy bi-a'rshihaa qabla ayyatu'niyy muslimiina; qaala 'ifriitum-minal jinni anaa aatiika bihii qabla a'n taquuma mim-maqaamika wa inniyy a'laiyhi laqawiyyun amiinun; qaala alladhiyy i'ndahuu i'lmum-minal kitaabi anaa aatiika bihii qabla ayyartadda ilaiyka tarfuka - falammaa ra'a-hu mustaqirraan i'ndahuu qaala haadhaa min fadli rabbiyy, meaning Prophet Sulaiyman said (to his own men): "Ye Chiefs! which of you can bring Queen (of Sheba) Bilqis' throne before they (i.e. the queen and her people) come to me in submission?" Said an Ifrit (large and powerful one) of the Jinns (genii): "I will bring it to thee before thou rise from thy Council; indeed I have full strength for the purpose, and may be trusted." Said one who had knowledge of the Book: "I will bring it to thee within the twinkling of an eye!" Then when Sulaiyman saw it (i.e. the throne) placed firmly before him, he said: "This is by the grace of my Lord!" 

According to the Koran, Prophet Sulaiyman wanted the queen Bilqis and her people to embrace the Islamic religion upon seeing a Divine Sign from the Prophet. So he made the above call to his own people. We can infer, from the story narrated by Allah, as follows:

1. Prophet Sulaiyman, though being a Prophet of Allah, sought help from his people - from the pious ones among his Ummah. The Prophet himself was a votary of Allah and could have asked Allah for the Sign himself, knowing fully well that his prayer wouldn't be turned down by his Lord, the Almighty. Moreover, as a Prophet, he too had the privileges of Divine Power. Yet, he asked for help from someone who was well-versed in the 'knowledge of the Book', and whose name was Asaf bin Barkhiya, the chief counsel at the Prophet's court. This person was spiritually enlightened and could work miracles (karaamat). 

2. Asaf bin Barkhiya brought the throne of queen Bilqis from Sheba in Yemen to Damascus in Syria, and that too, in the twinkling of an eye! In order to carry it for such a long distance, he had to be haadir (omnipresent) and naazir (able to see the throne from Damascus all the way to Yemen). It is also termed as tayy-i makaan in Arabic. This Koranic account bears testimony in favor of Sufi/dervishes' special powers granted by Allah Almighty.

3. The chief counsel at Prophet Sulaiyman's court is quoted in the Koran as saying, "I will bring it to thee within the twinkling of an eye." He didn't say that he would bring it if Allah granted him permission or the power; he said he would bring it 'within the twinkling of an eye'. Thus, it is crystal-clear that he knew the extent of his spiritual power. The Awliya or Sufi/dervishes know about the Divine Powers they possess.
 
4. The Ayah also grants us the permission to say that the Awliya, that is, the Sufi/dervishes can have ta'thir or effect on matters of the world and the hereafter. This is also termed as tasarruf in Arabic. In other words, they can work miracles. It is not shirk or polytheism to describe such Ahwal i.e. spiritual states of the Awliya; rather, it is compatible with the Sharia. And 

5. The Koranic verse pertains to Khabar, that is, narration of events, and henceforth, cannot be rescinded by any Hukm i.e. Law of the Sharia. In other words, the Koranic account of the event at the time of Prophet Sulaiyman stands throughout the prophet-hood of the last Prophet Hadrat Muhammad (sallallaahu alaiyhi wa sallam); meaning, till the End of the World.  

To conclude, asking the pious Anbiya (Prophets) and Awliya (Sufi/dervishes) to help us spiritually is a valid issue in the light of Islamic evidences. There are many proofs in the Koran and the Hadith (Sayings of the Prophet of Islam) that permit Muslims to have recourse to the pious ones of Allah. We have shed light on one of those here. May Allah grant all Muslims the foresight to accept this laudable act/deed in His view, Ameen! 

Wednesday, 11 March 2026

রাজ দরবারে সুন্নী-সূফী হক্কানী উলামা

 

- এডমিন।

সম্প্রতি দেশের ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীর দেয়া এক ইফতার পার্টিতে বিভিন্ন ঘরানার আলেমকে দেখা গেলেও সুন্নী জামা’আতভুক্ত আলেমদেরকে দেখা না যাওয়াতে অনেকে ফেসবুকে দুঃখ ও আফসোস প্রকাশ করেছেন। আমি এ ব্যাপারে কিছু কথা বলতে চাই।

প্রথমতঃ বাংলাদেশের ইতিহাসে এ চিত্র নতুন নয়। বিগত ৮০’এর দশক থেকেই আমরা এটা প্রত্যক্ষ করে আসছি। ইসলামের ইতিহাসেও এটা নতুন নয়। যুগে যুগে 'উলামায়ে সূ' তথা বদ-আকীদাধারী, বে-আমল, সুবিধাবাদী, দুনিয়ালোভী, নাম-প্রত্যাশী ও দুর্নীতিগ্রস্ত আলেমবর্গ রাজ দরবারের কৃপাদৃষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে ক্ষমতার আশপাশে ঘুরঘুর করেছে। এর বিপরীতে হক্কানী-রব্বানী (প্রকৃত খোদাপ্রেমিক) উলামা তথা আউলিয়া কেরাম (রহ.) রাজ দরবারকে এড়িয়ে চলেছেন। এটাই সুন্নী-সূফী মতাদর্শের ঐতিহ্য।

উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে ইমাম গাজ্জালী (রহমতুল্লাহি আলাইহ)-এর কথা। তিনি বাগদাদের খলীফার দরবারে সর্বোচ্চ ধর্মীয় উপদেষ্টা পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। কিন্তু তিনি যখন দেখলেন যে খলীফা ইসলামী বিধানের পরিপন্থী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছেন, তখন তিনি কাজে ইস্তফা দিয়ে নিজ পল্লীতে ফিরে যান এবং গৃহস্থালী (সম্ভবতঃ জমিতে ফসল ফলানোর বা ব্যবসার) কাজে লিপ্ত হন। বুযূ্র্গ ইমাম-আল্লামাবৃন্দ দুৃনিয়ার তোয়াক্কা করতেন না। রাজ দরবারের কৃপাদৃষ্টি লাভের চেষ্টাই করতেন না।
দিল্লীর নিজামউদ্দীন আউলিয়া চিশ্তী (রহমতুল্লাহি আলাইহ)-এর ঘটনা আরো চমকপ্রদ। তিনি তাঁর আস্তানায় একটি মসজিদ নির্মাণ আরম্ভ করেন। ওই সময়কার বাদশাহ গিয়াসউদ্দীন তুঘলকও সম্ভবতঃ হিংসাবশতঃ রাজকীয় মসজিদ নির্মাণের নির্দেশ দিয়ে বাংলার শাসকের বিরুদ্ধে অভিযানে দিল্লী ত্যাগ করেন। কিন্তু ওই মসজিদ নির্মাণের জন্যে বেশি মজুরি দিয়েও লোকবল পাওয়া যায় নি। অথচ চিশ্তী সুলতানের (রহ.) মসজিদ নির্মাণের ক্ষেত্রে লোকেরা বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করছিলেন। এভাবেই নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়। এদিকে, বাংলায় অভিযানশেষে বাদশাহ তুঘলুক যখন ফিরছিলেন, তখন চিশ্তী সুলতান (রহ.)-এর ওয়াকিফহাল মুরীদান তাঁদের পীর সাহেব কেবলা (রহ.)-এর প্রতি দিল্লী ত্যাগের আর্জি পেশ করেন এ কারণে যে, গিয়াসউদ্দীন তুঘলক ফিরে এলে মসজিদটিকে অনির্মিত দেখতে পেয়ে প্রতিহিংসামূলক জোর-জুলূম চালাতে পারেন। মুরীদানের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে চিশ্তী সুলতান (রহ.) পারসিক ভাষায় বলেন, ‘হনূজ দিল্লী দূর আস্ত’ (هنوز دهلی دور است)। মানে ’দিল্লী এখনো বহু দূরে।’ ওদিকে বাদশাহর পুত্র মুহাম্মদ বিন তুঘলক অভিযানে বিজয়ী পিতাকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্যে দিল্লীর উপকণ্ঠে একটি ভারী তোরণ নির্মাণ করেন। কিন্তু বাদশাহ নিজ হাতীতে চড়ে ওই তোরণের নিচ দিয়ে পার হওয়ার সময় প্রাণিটি পাগল হয়ে যায় এবং তোরণের পায়ায় জোরে আঘাত করলে তাসের ঘরের মতো তোরণটি বাদশাহর মাথার উপর ভেঙ্গে পড়ে। ফলে তিনি সেখানেই নিহত হন। চিশ্তী সুলতান (রহ.) কখনোই বাদশাহর দরবারে যান নি।

ইমাম গাজ্জালী (রহমতুল্লাহি আলাইহ)-এরও এরকম একটি কারামত রয়েছে। মরক্কোর রাজা কতিপয় উলামায়ে সূ-এর কুপরামর্শে তাঁর বই পুড়িয়েছিলো। তাঁর কাছে এ খবর এলে তিনি হালত-অবস্থায় দোয়া করেন। তাঁর জাহেরী জীবদ্দশাতেই ওই বাদশাহ বংশসুদ্ধ নিপাত হয়!
এটাই ইতিহাস ও ঐতিহ্য সুন্নী-সূফী হক্কানী/রব্বানী উলামা তথা আউলিয়া কেরাম (রহ.)-এর। আমার মূল বক্তব্য হলো, তাঁদের প্রকৃত উত্তরসূরী হতে হলে তাঁদের মতো কুরবাত-এ-ইলাহী তথা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি হাসিল করতে হবে, যাতে দোয়ার তাৎক্ষণিক জবাব পাওয়া যায়; আর কাশফ-কারামত বা অলৌকিক ক্ষমতা-দিব্যদৃষ্টিও লাভ হয়। শুধু তখনই দেখা যাবে দেশের শাসকের পেছনে ঘুরাঘুরির পরিবর্তে শাসককুলই সুন্নী-সূফী হক্কানী/রব্বানী উলামা তথা আউলিয়ার দরবারে আসা-যাওয়া করছেন। বস্তুতঃ ওই সূফীদের যুগেই ইসলাম ধর্মের পরম বিকাশ ঘটেছিলো; সারা বিশ্বজগতে এর ব্যাপক প্রচার-প্রসার হয়েছিলো।

মুর্শীদের মধ্যে বারোটি গুণ থাকা আবশ্যক

লেখক: মওলানা মুহাম্মদ নিজামউদ্দীন


ইসলামের আধ্যাত্মিক শিক্ষায় মুর্শীদ বা পীরের মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ। একজন সত্যিকার মুর্শীদ শুধু বাহ্যিক জ্ঞানদাতা নন; বরং তিনি মানুষের আত্মশুদ্ধি, নৈতিক উন্নতি ও আল্লাহমুখী জীবনের পথপ্রদর্শক। এজন্যই ইসলামের মহান আধ্যাত্মিক সাধক শায়খ আবদুল কাদির জিলানী (রহমতুল্লাহি আলাইহি) মুর্শীদের জন্য কিছু অপরিহার্য গুণাবলীর কথা উল্লেখ করেছেন।


তিনি বলেন, কোনো শায়খের জন্য মানুষের মুর্শীদ হয়ে বসা বৈধ নয়, যতোক্ষণ না তার মধ্যে বারোটি গুণ বিদ্যমান থাকে। এই গুণগুলোর মধ্যে দুটি আল্লাহ তাআলার গুণের অনুসরণ, দুটি নবী করীম ﷺ-এর গুণ, এবং বাকি আটটি চার খলীফা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম)-এর আদর্শ থেকে গ্রহণ করা।

প্রথমতঃ আল্লাহ তাআলার গুণ থেকে মুর্শীদের দুটি গুণ থাকা উচিত। একটি হলো পর্দাপোষ হওয়া, অর্থাৎ মানুষের দোষ-ত্রুটি প্রকাশ না করা; বরং তা গোপন রাখা। অন্যটি হলো ক্ষমাশীল হওয়া, যাতে মানুষের ভুলত্রুটি ক্ষমা করে তাদের সংশোধনের সুযোগ দেওয়া যায়।

দ্বিতীয়তঃ নবী করীম মুহাম্মদ ﷺ-এর আদর্শ থেকে দুটি গুণ গ্রহণ করা আবশ্যক। এগুলো হলো শফিকতা ও দয়া। একজন প্রকৃত মুর্শীদ মানুষের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল ও দয়ালু হবেন, যেমন নবী করীম ﷺ উম্মতের প্রতি ছিলেন।

তৃতীয়তঃ প্রথম খলীফা হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)-এর আদর্শ থেকে দুটি গুণ থাকা প্রয়োজন। একটি হলো সত্যবাদিতা, আর অন্যটি দানশীলতা। সত্যের ওপর অবিচল থাকা এবং আল্লাহর পথে দান-সদকা করা একজন আধ্যাত্মিক নেতার গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।

চতুর্থতঃ দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমর ইবন আল-খাত্তাব (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)-এর আদর্শ থেকে দুটি গুণ গ্রহণ করা দরকার। এগুলো হলো সৎকাজের নির্দেশ দেওয়া এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করা। সমাজকে ন্যায় ও সত্যের পথে পরিচালিত করার জন্য এই গুণ দুটি অপরিহার্য।

পঞ্চমতঃ তৃতীয় খলীফা উসমান ইবন আফফান (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)-এর আদর্শ থেকে দুটি গুণ থাকা উচিত। একটি হলো মানুষকে আহার করানো, অর্থাৎ উদারভাবে মানুষের সেবা করা। অন্যটি হলো রাতে ইবাদতে দাঁড়িয়ে থাকা, যখন অধিকাংশ মানুষ ঘুমিয়ে থাকে তখন আল্লাহর সামনে ইবাদতে মগ্ন থাকা।

ষষ্ঠতঃ চতুর্থ খলীফা হযরত আলী ইবন আবী তালিব (কার্রামা-আল্লাহু ওয়াজহাহু)-এর আদর্শ থেকে দুটি গুণ থাকা আবশ্যক। এগুলো হলো ইলম বা জ্ঞান এবং সাহসিকতা। একজন মুর্শীদের জ্ঞানী হওয়ার পাশাপাশি সত্যের পক্ষে দৃঢ় ও সাহসী হওয়াও জরুরি।

সুতরাং দেখা যায়, একজন প্রকৃত মুর্শীদের চরিত্রে আল্লাহ তাআলার রহমত ও ক্ষমা, নবী করীম ﷺ-এর দয়া, এবং খুলাফায়ে রাশেদীনের সত্যবাদিতা, ন্যায়পরায়ণতা, দানশীলতা, ইবাদতপ্রিয়তা, জ্ঞান ও সাহস—এই সব গুণের সমন্বয় থাকা উচিত। তখনই তিনি মানুষের জন্য প্রকৃত পথপ্রদর্শক হতে পারবেন।

📖 সূত্র: জিলাউল খাওয়াতির, পৃষ্ঠা ২০৩।