Wednesday, 11 March 2026

রাজ দরবারে সুন্নী-সূফী হক্কানী উলামা

 

- এডমিন।

সম্প্রতি দেশের ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীর দেয়া এক ইফতার পার্টিতে বিভিন্ন ঘরানার আলেমকে দেখা গেলেও সুন্নী জামা’আতভুক্ত আলেমদেরকে দেখা না যাওয়াতে অনেকে ফেসবুকে দুঃখ ও আফসোস প্রকাশ করেছেন। আমি এ ব্যাপারে কিছু কথা বলতে চাই।

প্রথমতঃ বাংলাদেশের ইতিহাসে এ চিত্র নতুন নয়। বিগত ৮০’এর দশক থেকেই আমরা এটা প্রত্যক্ষ করে আসছি। ইসলামের ইতিহাসেও এটা নতুন নয়। যুগে যুগে 'উলামায়ে সূ' তথা বদ-আকীদাধারী, বে-আমল, সুবিধাবাদী, দুনিয়ালোভী, নাম-প্রত্যাশী ও দুর্নীতিগ্রস্ত আলেমবর্গ রাজ দরবারের কৃপাদৃষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে ক্ষমতার আশপাশে ঘুরঘুর করেছে। এর বিপরীতে হক্কানী-রব্বানী (প্রকৃত খোদাপ্রেমিক) উলামা তথা আউলিয়া কেরাম (রহ.) রাজ দরবারকে এড়িয়ে চলেছেন। এটাই সুন্নী-সূফী মতাদর্শের ঐতিহ্য।

উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে ইমাম গাজ্জালী (রহমতুল্লাহি আলাইহ)-এর কথা। তিনি বাগদাদের খলীফার দরবারে সর্বোচ্চ ধর্মীয় উপদেষ্টা পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। কিন্তু তিনি যখন দেখলেন যে খলীফা ইসলামী বিধানের পরিপন্থী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছেন, তখন তিনি কাজে ইস্তফা দিয়ে নিজ পল্লীতে ফিরে যান এবং গৃহস্থালী (সম্ভবতঃ জমিতে ফসল ফলানোর বা ব্যবসার) কাজে লিপ্ত হন। বুযূ্র্গ ইমাম-আল্লামাবৃন্দ দুৃনিয়ার তোয়াক্কা করতেন না। রাজ দরবারের কৃপাদৃষ্টি লাভের চেষ্টাই করতেন না।
দিল্লীর নিজামউদ্দীন আউলিয়া চিশ্তী (রহমতুল্লাহি আলাইহ)-এর ঘটনা আরো চমকপ্রদ। তিনি তাঁর আস্তানায় একটি মসজিদ নির্মাণ আরম্ভ করেন। ওই সময়কার বাদশাহ গিয়াসউদ্দীন তুঘলকও সম্ভবতঃ হিংসাবশতঃ রাজকীয় মসজিদ নির্মাণের নির্দেশ দিয়ে বাংলার শাসকের বিরুদ্ধে অভিযানে দিল্লী ত্যাগ করেন। কিন্তু ওই মসজিদ নির্মাণের জন্যে বেশি মজুরি দিয়েও লোকবল পাওয়া যায় নি। অথচ চিশ্তী সুলতানের (রহ.) মসজিদ নির্মাণের ক্ষেত্রে লোকেরা বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করছিলেন। এভাবেই নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়। এদিকে, বাংলায় অভিযানশেষে বাদশাহ তুঘলুক যখন ফিরছিলেন, তখন চিশ্তী সুলতান (রহ.)-এর ওয়াকিফহাল মুরীদান তাঁদের পীর সাহেব কেবলা (রহ.)-এর প্রতি দিল্লী ত্যাগের আর্জি পেশ করেন এ কারণে যে, গিয়াসউদ্দীন তুঘলক ফিরে এলে মসজিদটিকে অনির্মিত দেখতে পেয়ে প্রতিহিংসামূলক জোর-জুলূম চালাতে পারেন। মুরীদানের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে চিশ্তী সুলতান (রহ.) পারসিক ভাষায় বলেন, ‘হনূজ দিল্লী দূর আস্ত’ (هنوز دهلی دور است)। মানে ’দিল্লী এখনো বহু দূরে।’ ওদিকে বাদশাহর পুত্র মুহাম্মদ বিন তুঘলক অভিযানে বিজয়ী পিতাকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্যে দিল্লীর উপকণ্ঠে একটি ভারী তোরণ নির্মাণ করেন। কিন্তু বাদশাহ নিজ হাতীতে চড়ে ওই তোরণের নিচ দিয়ে পার হওয়ার সময় প্রাণিটি পাগল হয়ে যায় এবং তোরণের পায়ায় জোরে আঘাত করলে তাসের ঘরের মতো তোরণটি বাদশাহর মাথার উপর ভেঙ্গে পড়ে। ফলে তিনি সেখানেই নিহত হন। চিশ্তী সুলতান (রহ.) কখনোই বাদশাহর দরবারে যান নি।

ইমাম গাজ্জালী (রহমতুল্লাহি আলাইহ)-এরও এরকম একটি কারামত রয়েছে। মরক্কোর রাজা কতিপয় উলামায়ে সূ-এর কুপরামর্শে তাঁর বই পুড়িয়েছিলো। তাঁর কাছে এ খবর এলে তিনি হালত-অবস্থায় দোয়া করেন। তাঁর জাহেরী জীবদ্দশাতেই ওই বাদশাহ বংশসুদ্ধ নিপাত হয়!
এটাই ইতিহাস ও ঐতিহ্য সুন্নী-সূফী হক্কানী/রব্বানী উলামা তথা আউলিয়া কেরাম (রহ.)-এর। আমার মূল বক্তব্য হলো, তাঁদের প্রকৃত উত্তরসূরী হতে হলে তাঁদের মতো কুরবাত-এ-ইলাহী তথা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি হাসিল করতে হবে, যাতে দোয়ার তাৎক্ষণিক জবাব পাওয়া যায়; আর কাশফ-কারামত বা অলৌকিক ক্ষমতা-দিব্যদৃষ্টিও লাভ হয়। শুধু তখনই দেখা যাবে দেশের শাসকের পেছনে ঘুরাঘুরির পরিবর্তে শাসককুলই সুন্নী-সূফী হক্কানী/রব্বানী উলামা তথা আউলিয়ার দরবারে আসা-যাওয়া করছেন। বস্তুতঃ ওই সূফীদের যুগেই ইসলাম ধর্মের পরম বিকাশ ঘটেছিলো; সারা বিশ্বজগতে এর ব্যাপক প্রচার-প্রসার হয়েছিলো।

মুর্শীদের মধ্যে বারোটি গুণ থাকা আবশ্যক

লেখক: মওলানা মুহাম্মদ নিজামউদ্দীন


ইসলামের আধ্যাত্মিক শিক্ষায় মুর্শীদ বা পীরের মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ। একজন সত্যিকার মুর্শীদ শুধু বাহ্যিক জ্ঞানদাতা নন; বরং তিনি মানুষের আত্মশুদ্ধি, নৈতিক উন্নতি ও আল্লাহমুখী জীবনের পথপ্রদর্শক। এজন্যই ইসলামের মহান আধ্যাত্মিক সাধক শায়খ আবদুল কাদির জিলানী (রহমতুল্লাহি আলাইহি) মুর্শীদের জন্য কিছু অপরিহার্য গুণাবলীর কথা উল্লেখ করেছেন।


তিনি বলেন, কোনো শায়খের জন্য মানুষের মুর্শীদ হয়ে বসা বৈধ নয়, যতোক্ষণ না তার মধ্যে বারোটি গুণ বিদ্যমান থাকে। এই গুণগুলোর মধ্যে দুটি আল্লাহ তাআলার গুণের অনুসরণ, দুটি নবী করীম ﷺ-এর গুণ, এবং বাকি আটটি চার খলীফা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম)-এর আদর্শ থেকে গ্রহণ করা।

প্রথমতঃ আল্লাহ তাআলার গুণ থেকে মুর্শীদের দুটি গুণ থাকা উচিত। একটি হলো পর্দাপোষ হওয়া, অর্থাৎ মানুষের দোষ-ত্রুটি প্রকাশ না করা; বরং তা গোপন রাখা। অন্যটি হলো ক্ষমাশীল হওয়া, যাতে মানুষের ভুলত্রুটি ক্ষমা করে তাদের সংশোধনের সুযোগ দেওয়া যায়।

দ্বিতীয়তঃ নবী করীম মুহাম্মদ ﷺ-এর আদর্শ থেকে দুটি গুণ গ্রহণ করা আবশ্যক। এগুলো হলো শফিকতা ও দয়া। একজন প্রকৃত মুর্শীদ মানুষের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল ও দয়ালু হবেন, যেমন নবী করীম ﷺ উম্মতের প্রতি ছিলেন।

তৃতীয়তঃ প্রথম খলীফা হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)-এর আদর্শ থেকে দুটি গুণ থাকা প্রয়োজন। একটি হলো সত্যবাদিতা, আর অন্যটি দানশীলতা। সত্যের ওপর অবিচল থাকা এবং আল্লাহর পথে দান-সদকা করা একজন আধ্যাত্মিক নেতার গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।

চতুর্থতঃ দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমর ইবন আল-খাত্তাব (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)-এর আদর্শ থেকে দুটি গুণ গ্রহণ করা দরকার। এগুলো হলো সৎকাজের নির্দেশ দেওয়া এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করা। সমাজকে ন্যায় ও সত্যের পথে পরিচালিত করার জন্য এই গুণ দুটি অপরিহার্য।

পঞ্চমতঃ তৃতীয় খলীফা উসমান ইবন আফফান (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)-এর আদর্শ থেকে দুটি গুণ থাকা উচিত। একটি হলো মানুষকে আহার করানো, অর্থাৎ উদারভাবে মানুষের সেবা করা। অন্যটি হলো রাতে ইবাদতে দাঁড়িয়ে থাকা, যখন অধিকাংশ মানুষ ঘুমিয়ে থাকে তখন আল্লাহর সামনে ইবাদতে মগ্ন থাকা।

ষষ্ঠতঃ চতুর্থ খলীফা হযরত আলী ইবন আবী তালিব (কার্রামা-আল্লাহু ওয়াজহাহু)-এর আদর্শ থেকে দুটি গুণ থাকা আবশ্যক। এগুলো হলো ইলম বা জ্ঞান এবং সাহসিকতা। একজন মুর্শীদের জ্ঞানী হওয়ার পাশাপাশি সত্যের পক্ষে দৃঢ় ও সাহসী হওয়াও জরুরি।

সুতরাং দেখা যায়, একজন প্রকৃত মুর্শীদের চরিত্রে আল্লাহ তাআলার রহমত ও ক্ষমা, নবী করীম ﷺ-এর দয়া, এবং খুলাফায়ে রাশেদীনের সত্যবাদিতা, ন্যায়পরায়ণতা, দানশীলতা, ইবাদতপ্রিয়তা, জ্ঞান ও সাহস—এই সব গুণের সমন্বয় থাকা উচিত। তখনই তিনি মানুষের জন্য প্রকৃত পথপ্রদর্শক হতে পারবেন।

📖 সূত্র: জিলাউল খাওয়াতির, পৃষ্ঠা ২০৩।